আন্তর্জাতিক ডেস্ক: লোহিত সাগর, বাব আল-মানদেব প্রণালি এবং এডেন উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি নতুন বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠন করা হয়েছে। এই জোটে বাংলাদেশসহ মোট ১৪টি দেশ যুক্ত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স (MMDA) নামে এই জোট গঠন করা হয়েছে, যার লক্ষ্য সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুট সুরক্ষিত রাখা এবং জ্বালানি সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখা।
গুরুত্বপূর্ণ জলপথ রক্ষায় যৌথ উদ্যোগ
সৌদি আরবের ভাষ্য অনুযায়ী, বাব আল-মানদেব প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডর। এই পথ ভারত মহাসাগরকে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
নতুন জোটের সদস্য দেশগুলো এসব জলপথে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে পারস্পরিক সহযোগিতা, তথ্য বিনিময় এবং যৌথ কার্যক্রম পরিচালনার অঙ্গীকার করেছে।
কোন কোন দেশ রয়েছে জোটে?
সৌদি নেতৃত্বাধীন এই জোটে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে—
বাংলাদেশ
তুরস্ক
পাকিস্তান
মিসর
জর্ডান
কুয়েত
কাতার
বাহরাইন
জিবুতি
সোমালিয়া
ইয়েমেন
সুদান
কমোরোস
সৌদি আরব
কেন এই জোট গঠন?
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলার কারণে লোহিত সাগর অঞ্চলে জাহাজ চলাচল ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
হুতিরা সৌদি আরবের তেলবাহী জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালানোর পাশাপাশি সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণাও দিয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক বাণিজ্য নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে।
বৈঠকে অংশ নেয় ৪৩টি দেশ
সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আমন্ত্রিত ৫১টি দেশের মধ্যে ৪৩টি দেশের প্রতিনিধি অংশ নেন। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি প্রতিনিধিদলও উপস্থিত ছিল।
উল্লেখ্য, লোহিত সাগরে ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের Aspides নামে একটি নৌ নিরাপত্তা মিশন পরিচালিত হচ্ছে। তবে সৌদি নেতৃত্বাধীন নতুন জোটের কার্যক্রম সেই উদ্যোগ থেকে কীভাবে আলাদা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হবে?
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই জোটের আওতায়—
গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়
যৌথ পরিকল্পনা গ্রহণ
সমন্বিত সামুদ্রিক মহড়া
নিরাপত্তা অভিযান পরিচালনা
ইত্যাদি কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
তবে সদস্য দেশগুলো কতসংখ্যক যুদ্ধজাহাজ, বিমান বা অন্যান্য সামরিক সক্ষমতা দিয়ে অংশ নেবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান নেই
মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) ও ওমান এই জোটে যোগ দেয়নি।
তবে সৌদি আরব জানিয়েছে, ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় জাতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অন্য দেশগুলোরও এই জোটে যোগ দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
আত্মরক্ষামূলক জোটের দাবি
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, এই সামুদ্রিক জোট সম্পূর্ণ আত্মরক্ষামূলক উদ্দেশ্যে গঠিত হয়েছে এবং এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি।
একই সঙ্গে তারা উল্লেখ করেছে, বর্তমান সময়ে সামুদ্রিক নিরাপত্তা একটি যৌথ দায়িত্ব। আন্তর্জাতিক জলপথে যেকোনো ধরনের হুমকি মোকাবিলায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতাই হবে এই জোটের মূল ভিত্তি।
কেন বাব আল-মানদেব এত গুরুত্বপূর্ণ?
বাব আল-মানদেব প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। ইরিত্রিয়া, জিবুতি ও ইয়েমেনের মাঝখানে অবস্থিত এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল তেল এবং বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ পরিবাহিত হয়।
প্রণালিটির সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ মাত্র ২৯ কিলোমিটার। ফলে এখানে নিরাপত্তা সংকট তৈরি হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কাও বেড়ে যায়।
উপসংহার
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান নিরাপত্তা সংকটের প্রেক্ষাপটে লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত এই বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশের অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপথ সুরক্ষায় সমন্বিত সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।